ছুটির শেষ দিনটার মতো বিষণ্ণ দিন আর কিছু হয় না।
সোফায় মুখ গুঁজে বসে ছিল নীল। বয়স সবে এগারো ছুঁয়েছে। সামনে খোলা পড়ে থাকা নীল রঙের ট্রলি ব্যাগটা যেন একটা আস্ত বিভীষিকা। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপরই কাল সকালের ট্রেনে তাকে ফিরে যেতে হবে দার্জিলিংয়ের সেই পাহাড়ি বোর্ডিং স্কুলে।
মা রান্নাঘর থেকে বারবার তাড়া দিচ্ছেন জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু নীলের শরীর যেন শক্ত পাথরের মতো অনড়। এক মাস বাড়ির আরাম, বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেলা, মায়ের হাতের পায়েস আর নিজের ঘরের বিছানা ছেড়ে আবার সেই স্কুলের চারদেয়াল, কড়া নিয়ম আর একঘেয়ে রুটিনে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেই তার বুকটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসছে।
"আমি যাব না মা! কিছুতেই যাব না। কাল সকালে আমার পেট খারাপ করবে, দেখে নিও!" নীলের গলায় একরাশ ক্ষোভ আর কান্না মেশানো জিদ।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা মায়ের ফোনটা বেজে উঠল। ভিডিও কল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা মুখ—রোদে পোড়া, চোখের কোণে ক্লান্তির সূক্ষ্ম রেখা, কিন্তু মুখে এক চিলতে অমলিন হাসি।
নীলের বাবা, অয়নবাবু। সুদূর কাতারের এক মরুশহরের কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করেন তিনি।
"কী রে আমার বাঘের মুখটা এমন মেঘলা কেন?" ওপার থেকে ভেসে এলো গভীর, স্নেহমাখা গলার আওয়াজ।
বাবাকে দেখেই নীলের অভিমান বাঁধ মানল না। সে ফোনটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে কেঁদে ফেলল, "বাবা, আমি আর ওই জেলখানায় ফিরব না! তুমি মা-কে বারণ করো। কেন আমাকে হোস্টেলে থাকতে হবে? তোমরা আমাকে ভালোবাসো না বলেই তো দূরে পাঠিয়ে দিয়েছ!"
স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখের হাসির আড়ালে যেন এক চিলতে যন্ত্রণা খেলে গেল, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। খুব শান্ত গলায় বললেন, "নীল, বারান্দায় এসে দাঁড়া তো একটু।"
নীল ফোন হাতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের আকাশটা তখন গোধূলির রক্তিম আলোয় ভরে উঠেছে।
"নীল, তোকে একটা সত্যি কথা বলি?" অয়নবাবু বললেন, "তুই ভাবিস বাড়ি ছেড়ে থাকতে শুধু তোরই কষ্ট হয়? কিন্তু ভেবে দেখেছিস, এই ঘরটা, এই বারান্দাটা ছেড়ে তিন বছর ধরে হাজার হাজার মাইল দূরে এক মরুভূমিতে একা একটা ছোট্ট ঘরে কে পড়ে থাকে?"
নীল থমকে গেল। সে কোনোদিন এভাবে ভেবে দেখেনি।
"তুই বলছিস এক মাস পর তোর হোস্টেলে ফিরতে দম আটকে আসছে," বাবার গলার স্বর ভারী হয়ে এলো, "আর আমি? বছর ঘুরে যায় তোদের মুখ দুটো চোখের দেখা দেখতে পাই না। প্রতিদিন ভোরবেলা যখন ঘুম ভাঙে, ধুলোবালি আর চল্লিশ ডিগ্রি গরমে যখন সাইটে দাঁড়িয়ে লোহার রড আর সিমেন্টের হিসেব কষি, তখন আমার মাথাটাও যন্ত্রণায় ফেটে যায় রে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায় এই ভেবে যে—আজ হয়তো নীলটা বিকেলে খেলছে, মা হয়তো চা খাচ্ছে, আর আমি এই চারকোনা নির্জন ঘরে একা একা ভাত খাচ্ছি।"
নীলের চোখের জল তখন শুকিয়ে এসেছে। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার সেই ক্লান্ত মুখটার দিকে।
"তাহলে তুমি চলে আসো না বাবা? কেন থাকো ওখানে?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল নীল।
"কারণ আমি একজন বাবা," অয়নবাবু মৃদু হাসলেন। "আমার এই একাকীত্ব, এই মাথার যন্ত্রণা, এই ঘর ছেড়ে পড়ে থাকা—সবকিছুর একটাই লক্ষ্য। আমি চাই আমার ছেলেটা এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে তাকে যেন আমার মতো পরদেশে রক্তজল করে দিন কাটাতে না হয়। তুই যাতে মাথা উঁচু করে দুনিয়ায় বাঁচতে পারিস।"
তারপর একটু থেমে খুব নরম গলায় বললেন, "একদিন তুইও বড় হবি নীল। তোর নিজের একটা সংসার হবে, তুইও একদিন বাবা হবি। তখন তোকেও হয়তো তোর পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য, তোর বাচ্চার হাসিমুখের জন্য নিজের সব প্রিয় জিনিস, নিজের এই নিশ্চিন্ত বাড়িটা ছেড়ে বেরোতে হবে। তখন তোকে শক্ত থাকতে হবে না? তখন যদি তুই চোখের জল ফেলে বলিস 'আমার একা থাকতে ভালো লাগছে না', তাহলে কি তোর সংসার চলবে রে?"
বাবার কথাগুলো নীলের ছোট্ট মনের একদম গভীরে গিয়ে ধাক্কা মারল।
"হোস্টেল তোকে পরিবার থেকে আলাদা করার জন্য নয় রে পাগল," অয়নবাবু বোঝালেন, "হোস্টেল তোকে তৈরি করছে। আজ তুই নিজের বিছানা নিজে গোছাতে শিখছিস, বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিতে শিখছিস, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একলা লড়তে শিখছিস। এই যে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা, এই যে একাকীত্বকে সহ্য করে নিজের লক্ষ্য স্থির রাখার অভ্যাস—এটাই তোকে ভবিষ্যতের আসল মানুষ বানাবে। আজ যদি তুই নিয়মের সাথে, এই শৃঙ্খলার সাথে সমঝোতা করতে না শিখিস, কালকের বড় পৃথিবীতে যখন তোকে আসল লড়াইটা লড়তে হবে, তখন তুই ভেঙে পড়বি।"
নীল ফোনটা শক্ত করে ধরল। সে দেখতে পাচ্ছিল বাবার ঘরের ব্যাকগ্রাউন্ডটা—একদম সাদামাটা একটা দেয়াল, একটা খাঁটিয়া, আর টেবিলে রাখা একাকী জলের বোতল। এই মানুষটা তার জীবনের সমস্ত আরাম, সুখ, পারিবারিক আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পড়ে আছেন শুধু তার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়।
আর সে কিনা সামান্য কয়েকটা মাসের জন্য স্কুল যেতে বায়না করছে?
"বাবা..." নীলের গলাটা আর কাঁপল না, বরং একটু দৃঢ় শোনাল।
"বল রে?"
"মাথা ব্যথা করলে তুমি মাথায় একটু জল দিও তো। আর... কাল সকালে আমি ঠিক সময়ে স্টেশনে যাব। তুমি চিন্তা কোরো না।"
ওপার থেকে অয়নবাবুর চোখে চিকচিক করে উঠল আনন্দাশ্রু। যে ছেলেকে তিনি এতক্ষণ ধরে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, সেই ছেলে এক নিমেষেই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে।
ফোনটা রাখার পর নীল আস্তে আস্তে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে গেল। মেঝেতে পড়ে থাকা নীল ট্রলি ব্যাগটার চেইনটা টেনে খুলে সে একটা একটা করে বই আর জামাকাপড় গোছাতে শুরু করল।
কাল তাকে ফিরতেই হবে। বাবার ঘামের দাম তাকে যে ফেরত দিতে হবে একজন সার্থক মানুষ হয়ে।